বৃহস্পতিবার ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১৩ ফাল্গুন ১৪৩২

ই-পেপার

নিজস্ব প্রতিবেদক :

প্রিন্ট সংস্করণ

ফেব্রুয়ারি ২৫,২০২৬, ০৬:০৭

তাজুল গংয়ের হাজার কোটি টাকা লুটের অভিযোগ : ফাঁস হয়েছে ব্যাংকের নথি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সদ্য অপসারিত চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের 'গণহত্যা' মামলাকে পুঁজি করে নজিরবিহীন চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, বিচারের নামে তিনি ও তার সিন্ডিকেট ট্রাইব্যুনালকে একটি 'ক্যাঙ্গারু কোর্ট' এবং চাঁদাবাজির হাতিয়ারে পরিণত করেছিলেন। মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রলোভন ও নাম ঢুকিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্যবসায়ী, পুলিশ, সেনা কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।

সম্প্রতি ফাঁস হওয়া কিছু ব্যাংক ডিপোজিট স্লিপ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে প্রকাশ্যে আসা প্রসিকিউটরদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে এই দুর্নীতির ভয়ংকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।

যেভাবে চলতো চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আইসিটির চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পান মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ পাওয়ার পরপরই তিনি ট্রাইব্যুনালে নিজ ঘনিষ্ঠ এবং নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের (জামায়াত-শিবির) অনুসারীদের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপরই শুরু হয় তাদের আসল কাজ—মামলা-বাণিজ্য।

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহতের ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোতে আসামি করার ভয় দেখিয়ে টার্গেট করা হতো বিত্তবান ব্যবসায়ী, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তাদের নাম মামলা থেকে বাদ দেওয়া হতো অথবা চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো।

ক্যাশিয়ার তামিম ও ভাগাভাগির দ্বন্দ্ব
এই সিন্ডিকেটের অন্যতম 'মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে তাজুল ইসলামের পাশাপাশি প্রসিকিউটর গাজী মনোয়ার হোসেন তামিমের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তামিম ছিলেন এই সিন্ডিকেটের 'মূল ক্যাশিয়ার'। অবৈধ লেনদেনের বেশিরভাগই সম্পন্ন হতো নগদে।

তবে এই দুর্নীতির খবর প্রথম প্রকাশ্যে আসে খোদ ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর বিএম সুলতান মাহমুদের মাধ্যমে। তিনি প্রকাশ্যে তাজুল ও তামিমের বিরুদ্ধে 'সেটলিং বাণিজ্য' এবং ভারী ব্যাগে ঘুষের টাকা লেনদেনের অভিযোগ তোলেন। যদিও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, দুর্নীতির প্রতিবাদ নয়, বরং অবৈধ টাকার 'ভাগাভাগি' নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জেরেই এই গোমর ফাঁস করেছেন সুলতান মাহমুদ।

অনুসন্ধানে ব্যাংক লেনদেনের অকাট্য প্রমাণ
অধিকাংশ লেনদেন নগদে হলেও, সিন্ডিকেটটি এতটাই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল যে, সরাসরি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমেও তারা ঘুষের টাকা গ্রহণ করেছে। আমাদের অনুসন্ধানে এমন তিনটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য এবং বেশ কিছু টাকা জমার রশিদ (ডিপোজিট স্লিপ) হাতে এসেছে।

একটি নির্দিষ্ট ঘটনা থেকে জানা যায়, মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার চুক্তিতে মাত্র একজনের কাছ থেকেই ২৫ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছিল। এই টাকাগুলো জমা হয়েছিল নিচের অ্যাকাউন্টগুলোতে:

১. প্রাইম ব্যাংক লিমিটেড (আইবিবি মিরপুর ব্রাঞ্চ):
অ্যাকাউন্টের নাম: মো. আবুল হোসেন (MD. ABUL HOSSAIN)
অ্যাকাউন্ট নং: ৩১৩৩২১৭০০৭৫২৮
প্রাপ্ত স্লিপ বিশ্লেষণ: হাতে আসা দুটি স্লিপে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর এই অ্যাকাউন্টে ১০ লাখ টাকা এবং ২৭ নভেম্বর আরও ১০ লাখ টাকা জমা দেওয়া হয়েছে। জমার উদ্দেশ্যে 'লোন পেমেন্ট' বা 'বিজনেস' জাতীয় কথা লেখা থাকলেও, সূত্র দাবি করছে এটি মূলত ঘুষের টাকা।

২. যমুনা ব্যাংক (মতিঝিল ব্রাঞ্চ):
অ্যাকাউন্টের নাম: মো. সাইফুল ইসলাম (MD. SAIFUL ISLAM)
অ্যাকাউন্ট নং: ১১০১০০৬৬৬৭৬৮৮
প্রাপ্ত স্লিপ বিশ্লেষণ: ২০২৪ সালের ২৭ নভেম্বর এই অ্যাকাউন্টে সরাসরি ক্যাশ কাউন্টারে জমা দেওয়া হয় ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। একই দিনে (২৭.১১.২৪) যমুনা ব্যাংকের সিআরএম (ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন বা এটিএম) ব্যবহার করে ওই একই অ্যাকাউন্টে আরও দুটি বড় অঙ্কের জমা পড়ে—একটি ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এবং অন্যটি ১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।

৩. স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (গুলশান ব্রাঞ্চ):
অ্যাকাউন্টের নাম: মো. জাহিদ হাসান নয়ন
অ্যাকাউন্ট নং: ১৮৭০২১০১৪০১ (এই অ্যাকাউন্টেও মোটা অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে)।

এটি দুর্নীতির বিশাল সাগরের একটি বিন্দুমাত্র বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এই তিনটি অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট এবং সিসিটিভি ফুটেজ তলব করলেই টাকার প্রকৃত প্রেরক ও গ্রহীতার আসল পরিচয় বেরিয়ে আসবে।

সূত্র মতে, চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ২০২৪ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে ২১ দিনের এক দীর্ঘ সফরে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় গিয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, দেশে আদায় করা হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির একটি বড় অংশ হুন্ডি বা অন্যান্য মাধ্যমে উত্তর আমেরিকায় পাচার করা হয়েছে এবং ওই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল সেই অর্থের লেনদেন ও বন্দোবস্ত করা। সমালোচকরা দাবি করছেন, আইন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের প্রশ্রয় ছাড়া এতো বড় পরিসরে এমন দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব।

দুর্নীতির এই ভয়াবহ অভিযোগ এবং ট্রাইব্যুনালের ভেতরে চরম বিশৃঙ্খলার মুখে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাজুল ইসলামকে চিফ প্রসিকিউটরের পদ থেকে অপসারণ করে। তার জায়গায় অ্যাডভোকেট মো. আমিনুল ইসলামকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে অপসারিত হওয়ার পর তাজুল ইসলাম একটি বিবৃতি দিয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, "গণহত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং তাদের সুবিধা দিতেই একটি মহল আমার বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।" অপর প্রসিকিউটর তামিমও অভিযোগগুলোকে 'ভিত্তিহীন' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু প্রকাশ্যে আসা ব্যাংক স্লিপ এবং নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্ট নম্বরগুলো এই অস্বীকারের পালে হাওয়া লাগতে দিচ্ছে না। মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যায়বিচারের সর্বোচ্চ স্থানে বসে যারা নিরপরাধ মানুষকে জিম্মি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদেরও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো উচিত। রাষ্ট্রযন্ত্র এই ব্যাংক অ্যাকাউন্টগুলোর সূত্র ধরে তদন্ত করলে আইসিটি ট্রাইব্যুনালের পেছনের এই কালো অধ্যায়ের পুরো সত্য দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হবে।

আপনার মতামত জানান :

মন্তব্য করতে লগইন করুন. লগইন

(0)টি মন্তব্য

কেউ মন্তব্য করেনি :)